“স্কুল” শব্দের ব্যাপারে শুরুতে আমার ধারণা ছিল অনেকটা জেলখানার মত। ভাবতাম এখানে ছোট বাচ্চাদের জোড়পূর্বক ধরে পড়াশুনা করানো হয় যাতে তারা সকাল কিংবা দুপুরবেলা খেলাধূলা করতে না পারে। মুলত আমার স্কুলপড়ুয়া বন্ধুদের দেখেই মূলত এই ধারণা হয়। কিন্তু একসময় দেখা গেল আমার বাবা মা-ই আমাকে এই জেলখানায় ভর্তির জন্য আপ্রাণ চেস্টা করতে লাগল। অনেকগুলো স্কুল দেখার পর আমাদের বাড়ির কাছেই একটি ইংরেজী মিডিয়াম স্কুল বেছে নেয়া হল। দেখতে না দেখতেই এসে গেল সেই বিশেষ দিন যেদিন আমাকে স্কুলে যেতে হবে। আগের রাতে বাবা-মার কড়া নির্দেষ তাড়াতাড়ি ঘুমাও কাল সকালে স্কুলে যেতে হবে। কিন্তু স্কুল নামক জেলখানায় যেতে আমার কোনই আগ্রহ নেই। কেননা একদিন স্কুলে যাওয়ার অর্থ সকালবেলার খেলা মাটি হওয়া। সেসাথে স্কুল থেকে আবার হোমওয়ার্ক নামক বিশেষ এক ঝামেলা প্রদান করে যার জন্য অনেকসময় রাতের বেলাতেও খেলাধূলা করা মুশকিল। তবুও মনের মধ্যে কেমন জানি একটি চাপা উত্তেজনা কাজ করছিল। সকালে বাবার চিল্লাচিল্লিতে ঘুম ভাংগে।
উঠ তাড়াতাড়ি উঠ আজকে স্কুলে যেতে হবে। বাধ্য হয়ে একসময় ঘুম বিসর্জন দিয়ে উঠাই লাগল। দেখলাম আমার স্কুলে যাওয়া নিয়ে আমার চেয়ে আমার বাবা-মার আগ্রহ শতগুন বেশি।
-> আমি প্রথমেই প্রশ্ন করলাম আচ্ছা ওইখানে খেলনা আছে ত খেলার জন্য?
-> হ্যাঁ। অনেক খেলনা আছে আগে তাড়াতাড়ি খেয়ে রেডি হও।
এরপর জোড়পূর্বক কিছু খাদ্য আমার মুখে ঠেসে দেয়া হল। ছোটবেলার খাবারের প্রতি আমার কোন আগ্রহই ছিল না। তাই নানা কায়দা কসরত করে মা আমাকে কিছু খাবার খাওয়াত। খাওয়া দাওয়ার পর স্কুলে যাব তাই জামা পড়ে রেডি হলাম। কিন্তু সমস্যা বাধল আমার কোন ব্যাগ নেই। সেসময় আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব বেশি ভাল ছিল না। তাই অনেকটা টানা হেচড়া করেই আমাদের দিন পার করা লাগত।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর মা কোথা থেকে যেন একটি কাধে ঝুলানোর ব্যাগ নিয়ে আসল। তাতে ময়লা লেগে রয়েছে। ব্যাগটি দেখেই আমি বায়না ধরলাম ব্যাগ নেই আমি স্কুলে যাব না। এবার আর কোন ছাড় নেই জোড় করেই আমাকে নিয়ে রিক্সায় তোলা হল আর সোজা স্কুলে গিয়ে নামলাম। স্কুলের সামনে কোন মাঠ নেই দেখে মনটা গেল আরও খারাপ হয়ে। আমার ভর্তি আগেই করানো ছিল। নার্সারি এর water lily সেকশন রোল ১। কিন্তু সমস্যা বাধল যখন দেখা গেল water lily সেকশনের রুমের বাতি বন্ধ। আমি অবশ্য এতে খুশিই হলাম। কিন্তু তখনই পাশের ক্লাসের ম্যাম এসে বলল আমাকে তার ক্লাসে নিয়ে যেতে।
এইসময় আমার ভিতরে অনেক ভয়ের উদয় হল। একটি সেকশনে ২০-৩০ জন শিক্ষার্থী যাদের কেউই আমার পরিচিত না। আবার এক মিস। আচ্ছা মিস কি আমাকে মারবা? এসব ভাবতে ভাবতেই আম্মুকে বললাম আম্মু চল বাসায় যাই আমার এখানে ভাল লাগছে না। কিন্তু কে শুনে কার কথা। ম্যাম আর মা দুজন মিলে আমাকে ক্লাসে নিয়ে গেল। এদিকে আমার দুচোখ ভরে ঝড়নার মত পানি পড়া শুরু করল। তখন হঠাত একটি মেয়ে বলল এই ছেলে কাঁদ কেন এদিকে আস আমার পাশে বস। বলেই মেয়েটি একপাশে চেপে আমাকে বসার জায়গা করে দিল। কিন্তু আমার কান্না কোনমতেই থামে না। ওদিকে আবার জানালা দিয়ে উকি দিয়ে দেখি আম্মু চলে যাচ্ছে। এপাশ থেকে আমি চিৎকার দিয়ে বললাম আম্মু তুমি যেয় না। কিন্তু আম্মু ইশারায় বলল বাসায় অনেক কাজ তাই এখন আর থাকা যাবে না। এদিকে আমার মন ভুলানোর জন্য ম্যাম কিছুক্ষন আমাকে মজার মজার কথা বললেন। কিন্তু কাজ হল না। অন্যদিকে আমার কান্না শুনে অন্যপাশ আরেকটা ছেলেও হুট করে কেঁদে উঠল। এসময় পাশে বসা মেয়েটা আমাকে বলল খাতা পেন্সিল বের করতে। শব্দহীনভাবে কান্না করতে করতে আমি কোনমত ব্যাগ থেকে খাতা আর কলম বের করলাম। তখন পাশের মেয়েটা বলল দেখ এখানে কান্না করার কিছু নেই আমরা সবাই এখানে তোমার বন্ধু হব। তার আশ্বাসে ধীরে ধীরে ঠিক হলাম আমি। অথচ ততক্ষনে একটি পিরিয়ড শেষ হয়ে আরেকটি পিরিয়ড শুরু হয়ে গিয়েছিল।
স্কুলের প্রথম দিনটা আমার জন্য তেমন সুখকর না হলেও আস্তে আস্তে এই স্কুলটা আমার নিকট অতি প্রীয় হয়ে উঠল। এখানকার টিচারদের ব্যবহার ছিল খুবই আন্তরীক। প্রতিদিন ক্লাসে আমরা শুধু পড়াশুনাই করতাম না এরসাথে টিচাররা আমাদের অনেক গল্প শুনাত আর ক্লাসের শেষের দিকে হত গান। ছোটবেলের সেসব গানের কিছুকিছু আমার এখনো মনে আছে।
আর বন্ধু-বান্ধব। সেটাও মোটামুটি ভালই জুটেছিল।

Comments
Post a Comment